আগামী রোববার, ১৯ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম প্রস্তুত হতে যাচ্ছে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা এক দ্বৈরথের সাক্ষী হতে। একদিকে কোপা আমেরিকার রাজা, লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে ইউরোর মুকুটধারী, লামিনে ইয়ামালের স্পেন।
মাঠের লড়াইয়ে চোখ ধাঁধানো সব ফুটবলার থাকলেও, এই মহারণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন আরও একজন। তিনি কোনো গোল করবেন না, কোনো দুর্দান্ত সেভও দেবেন না, তবে তার একটি ইশারা বদলে দিতে পারে ইতিহাসের গতিপথ। তিনি স্লাভকো ভিনচিচ। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, শিরোপা নির্ধারণী এই ফাইনালে বাঁশি বাজানোর গুরুদায়িত্ব পড়েছে ৪৬ বছর বয়সী এই স্লোভেনিয়ান রেফারির কাঁধেই। ফুটবল বিশ্বের নজর এখন তার দিকেই।
আবেগের বিস্ফোরণ: যখন স্বপ্ন পূরণের খবর এল
রেফারিদের আমরা সাধারণত মাঠের কঠোর এক চরিত্র হিসেবেই দেখি। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখে কড়া দৃষ্টি। কিন্তু এই কঠোর আবরণের আড়ালেও যে একটা নরম হৃদয় থাকে, তা ফুটবল বিশ্ব দেখল ফিফার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে। একটি হলরুমে বসে আছেন বিশ্বকাপের সব রেফারি। সামনে বড় স্ক্রিন। সেখানে ফিফার রেফারিং বিভাগের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা যখন ফাইনালের রেফারি হিসেবে স্লাভকো ভিনচিচের নাম ঘোষণা করলেন, তখন ঘটে গেল এক জাদুকরী মুহূর্ত। আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন ভিনচিচ, সতীর্থরা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, সে সময় এই ৪৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ রেফারির দু’চোখ বেয়ে পড়ছিল আনন্দাশ্রু। কলিনা যখন বলছিলেন, ‘গোল্ডেন স্ট্রাইপস পরিহিত জার্সিতে নামা সত্যিই দারুণ অনুভূতির,’ তখন যেন ভিনচিচের পুরো জীবনের সাধনা পূর্ণতা পাচ্ছিল। একজন রেফারির জীবনে বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করার চেয়ে বড় কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে না।
স্লাভকো ভিনচিচ: স্লোভেনিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায়

স্লোভেনিয়া থেকে উঠে আসা এই রেফারি ২০১০ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। এরপর থেকে ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার।
২০২২ সালে উয়েফা ইউরোপা লিগের ফাইনাল (ফ্রাঙ্কফুর্ট বনাম রেঞ্জার্স) এবং ২০২৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল (রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বরুসিয়া ডর্টমুন্ড) পরিচালনার মতো ভারী অভিজ্ঞতা রয়েছে তার ঝুলিতে। কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বমঞ্চে অভিষেক হওয়া ভিনচিচ চলতি আসরেও দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
রোববারের ফাইনালটি হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ এবং এই আসরের চতুর্থ দায়িত্ব। বড় তারকাদের ইগো সামলে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখার দারুণ এক স্বভাবজাত ক্ষমতা আছে তার।
আর্জেন্টিনার ‘অপয়া’ স্মৃতি: সেই সৌদির রাত কি আবার ফিরবে?
ফাইনালের রেফারির নাম ঘোষণার পর থেকেই আর্জেন্টাইন শিবিরে কিছুটা অস্বস্তি। কারণ, লিওনেল মেসিদের সঙ্গে ভিনচিচের একমাত্র স্মৃতিটা একেবারেই সুখকর নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের প্রথম ম্যাচে রেফারি ছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে সৌদি আরব ২-১ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল, আর ভেঙে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
ভিনচিচের বাঁশিতেই সেদিন মেসিরা পেয়েছিলেন পেনাল্টি, যা থেকে গোলও এসেছিল। কিন্তু এরপর তিনটি অফসাইড গোল বাতিল এবং দ্বিতীয়ার্ধে সৌদির অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ম্যাচটা হেরে যায় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের পর কাতার বা বর্তমান বিশ্বকাপে বিশ্বমঞ্চে আর কোনো ম্যাচ হারেনি স্কালোনির দল। তাই ভক্তদের মনে একটা কুসংস্কার কাজ করছে—ভিনচিচ কি তবে আর্জেন্টিনার জন্য ‘অপয়া’?
স্পেন ও ভিনচিচ: লা রোজাদের জন্য কি তিনি সৌভাগ্যের?
আর্জেন্টিনার জন্য তিনি ‘অপয়া’ বিবেচিত হলেও স্পেনের জন্য ভিনচিচ বেশ সৌভাগ্যের। উয়েফার সেরা রেফারিদের একজন হওয়ায় স্পেনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে তার। ২০১৭ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শুরু, এরপর ইউরো ২০২০ এবং ২০২৩ সালের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে ইতালি-স্পেন হাইভোল্টেজ ম্যাচেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্পেন সেই ম্যাচগুলোতে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দেই খেলেছে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, আগের সেই স্পেন আর বর্তমান স্পেনের মধ্যে বিস্তর ফারাক। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামসদের মতো তরুণদের গড়া স্পেনের এই নতুন আক্রমণভাগের সঙ্গে ভিনচিচের এটাই প্রথম বড় পরিচয় হতে যাচ্ছে।
ভিনচিচের সহ রেফারি: মেটলাইফে যারা থাকছেন পাহারায়
ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে একা একজন রেফারির পক্ষে পুরো মাঠ নিখুঁতভাবে নজরদারি করা অসম্ভব। তাই ভিনচিচের সঙ্গে মেটলাইফে থাকছেন তারই দুই পরীক্ষিত স্বদেশি—তোমাজ ক্লানচনিক ও আন্দ্রাজ কোভাচিচ। তারা সহকারী রেফারি হিসেবে লাইন সামলাবেন। চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ। আর রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকছেন কাতারের মোহাম্মদ আলকালাফ। এই পুরো দলটির বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি।
প্রযুক্তির যুগে রেফারির স্নায়ুযুদ্ধ
আগে রেফারিদের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু আজকের আধুনিক ফুটবলে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজির যুগে রেফারিদের কাজটা একই সঙ্গে সহজ ও কঠিন হয়ে গেছে। সহজ, কারণ প্রযুক্তি তাদের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেয়। আর কঠিন, কারণ মাঠে নেওয়া প্রতিটি সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত মাঠের বাইরের স্ক্রিনে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে একদিকে থাকবে হাজারো দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার, অন্যদিকে কানের ইয়ারপিসে ভিএআর রুম থেকে আসা সাংকেতিক বার্তা। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে স্নায়বিক চাপ, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, কিংবা ভিএআর দেখতে যাওয়ার একটি বিলম্বিত পদক্ষেপ—যেকোনো কিছুই সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের খোরাক হতে পারে বা জন্ম দিতে পারে যুগের পর যুগ টিকে থাকা বিতর্কের। ভিনচিচকে লড়তে হবে সেই অদৃশ্য চাপের সঙ্গেই।
ইতিহাস লেখার প্রস্তুতি
বিশ্বকাপের ফাইনাল এমন একটি মঞ্চ, যেখানে নায়কেরা জন্ম নেন, আর ভিলেনরা ইতিহাসের পাতায় জায়গা পান। রেফারিরা সাধারণত প্রশংসা পান কম, কিন্তু ভুলের জন্য সমালোচিত হন সবার আগে। রোববারের রাতে যখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলবে, তখন স্লাভকো ভিনচিচ শুধু একটি ম্যাচ পরিচালনা করবেন না, তিনি নিশ্চিত করবেন যেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিটা কোনো বিতর্কের কালিমা ছাড়াই যোগ্য দলের হাতে ওঠে। আর্জেন্টিনার ‘অপয়া’ তকমা ঘুচিয়ে, স্পেনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বাঁশি তার হাতে, এবার ইতিহাস লেখার পালা।

