প্রায়শই আমরা একটি কথা শুনে থাকি যা আমাদের মনে সবসময় কৌতূহলের জন্ম দেয়। সেটি হলো পৃথিবী সপ্তাশ্চর্যগুলো কী?
আদতে, পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য বলতে সেইসব জায়গাকে বোঝায়, যা আধুনিক যুগে মানবসভ্যতার স্থাপত্য, প্রকৌশল ও নান্দনিক কৃতিত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। ২০০৭ সালে বিশ্ব সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত এই ঐতিহসিক স্থানগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পৌরাণিক ইতিহাস, কিংবদন্তি ও অমীমাংসিত রহস্যের ভাণ্ডার।
চলুন, জেনে নিই আমরা পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের সব অজানা রহস্য সংক্ষেপে।
১) মাচু পিচু
মাচু পিচু বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন বহন করে যাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। পেরুর আন্দিজ পর্বতের কোলে বিদ্যমান ইনকা সভ্যতার এই নগরীর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪৩০ মিটার উচ্চতায়।
এই জনপদটির বিশেষত্ব হলো–এখানকার সকল বসতি ও স্থাপনা বিশাল পাথরের বেদিতে নির্মিত। তবে কোনোরূপ মর্টার ছাড়াই এমনভাবে বসানো স্থাপনাগুলো ছিল দৃঢ় ভূমিকম্প প্রতিরোধী। কিন্তু কোন রাজা বা কী উদ্দেশ্যে নগরীটি নির্মিত—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অঞ্চলটিতে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের আগমনের আগেই নগরীটি পরিত্যক্ত হয়েছিল বলেই ধারণা করা হয়।
২) পেত্রা
পৃথিবীর আরেক আশ্চর্যজনক স্থাপনা হলো পেত্রা। জর্ডানের মরুভূমির বুক চিরে লাল পাথরে খোদাই করে গড়ে তোলা এই নগরী নাবাতীয় জনপদের রাজধানী ছিল। পেত্রার ‘আল-খাজনেহ’ ভবনের সূক্ষ্ম নকশা আজও আধুনিক প্রকৌশলীদের ভাবায়। তবে এই জনপদটির পানি ব্যবস্থাপনার কৌশলগত ধারণা ছিল অনন্য।
অঞ্চলটির পৌরাণিক বাসিন্দারা মরুভূমিতে বৃষ্টি সংরক্ষণ করে নগরী টিকিয়ে রেখেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তবে হঠাৎ কী কারণে এই ঐতিহাসিক জনপদের বিলুপ্তি ঘটে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে প্রত্নতত্ত্ব গবেষকরা এর কোনো সুরাহা পাবেন।
৩) চীনের মহাপ্রাচীর
চীনের মহাপ্রাচীরের কথা কে না জানে! ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই প্রাচীর বিভিন্ন রাজবংশের সময়ে নির্মিত ও বিস্তৃত হয়েছে ক্রমান্বয়ে। মূলত, বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রাচীন চীনা রাজারা এটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে এটি নির্মাণে লিপ্ত থাকা শ্রমিকদের জীবনহানির ইতিহাস এর একটি অন্ধকার অধ্যায়।
৪) চিচেন ইতজা
মেক্সিকোর মায়াবী নগরী চিচেন ইতজা। এটির ‘এল কাস্তিলো’ পিরামিড জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিখুঁত উদাহরণ বলে সমাদৃত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞদের কাছে।
বসন্ত ও শরতের বিষুব দিনে সূর্যের আলোয় এই পিরামিডের সিঁড়িতে আশ্চর্যজনক সাপের ছায়া তৈরি হয়। যা মায়া গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার অসাধারণ প্রমাণ হিসেবে পরিগণিত।
তবে এল কাস্তিলো পিরামিডের অন্দরে অঞ্চলটির শাসকেরা মানুষদের বলি দিতেন বলে কিংবদন্তি রয়েছে। বাস্তবে এখানে মানববলির প্রথা ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে গবেষকরা কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনও হাজির করতে পারেননি।
৫) কলোসিয়াম
রোমান সাম্রাজ্যের ‘কলোসিয়াম’ নামের এই বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটার গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত। এতে একসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার দর্শক বসে রোমের সেরা যোদ্ধাদের লড়াই উপভোগ করতেন।
বহু বছরের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প, অসাধু নানা চক্রের লুটতরাজ আর সময়ের আঘাত সত্ত্বেও এটির ভৌত কাঠামো টিকে আছে এখনও। কলোসিয়ামের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে তখনকার প্রযুক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়।
৬) তাজমহল
মোগল সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের স্মারক হিসেবে নির্মিত এই সমাধি স্থাপত্যের ভারসাম্য ও প্রতিসাম্যের অনন্য উদাহরণ হলো তাজমহল। ভারতের আগ্রায় বিশেষ ধরনের মার্বেলের সমন্বয়ে গড়া এই স্থাপনার রঙ দিনের নানা অংশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এটি ভোরে গোলাপি, দিনে সাদা, রাতে রুপালি বর্ণে বিদ্যমান থাকে।
অন্যান্য সব আশ্চর্যজনক স্থাপনার মতো তাজমহল ঘিরেও রয়েছে ‘কালো তাজমহল’ নির্মাণের কিংবদন্তি, যার ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে না। এ ছাড়া, এটি নির্মাণে সম্পৃক্ত শ্রমিকরা যাতে এমন কোনো স্থাপনা পুনরায় বানাতে না পারেন, সেজন্য তাদের হাত কর্তন করা হয় বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। বাস্তবে সেটিরও কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই।
৭) ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার
ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃহদাকারের এই ভাস্কর্য খ্রিস্টান বিশ্বাসের প্রতীক। ৩০ মিটার উঁচু মূর্তিটি বজ্রপাত সহ্য করার মতো করে নির্মিত হয়েছে।
এটির ভেতরের কাঠামো ও বাহ্যিক কংক্রিটের সমন্বয় আধুনিক ভাস্কর্যের প্রকৌশল কৌশলকে তুলে ধরে অনন্য শৈল্পিক মাত্রায়।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই সাত আশ্চর্য কেবল দর্শনীয় স্থাপনা নয়। এগুলো মানবসভ্যতার জ্ঞান, কল্পনা ও অধ্যবসায়ের সর্বোৎকৃষ্ট দলিল বহন করে। এইসব স্থাপনার ভেতরে লুকিয়ে আছে আদতে এক অজানা প্রশ্ন–যেগুলো আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের নতুন নতুন কৌতূহলী অনুসন্ধানের প্রেরণা জোগায়।
#আরএ

