কাজী জেসিন বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত কবি, লেখক, সাংবাদিক, টিভি ব্যক্তিত্ব ও প্রযুক্তিবিদ। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, টকশো উপস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি খাতে কাজের পর ২০২৬ সালের আগস্টে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রথাগত সংবাদ পরিবেশনার আড়ালে যেসব মানুষ নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও কাজের দক্ষতায় দর্শকহৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নেন, কাজী জেসিন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদ পাঠকের যে সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও গাম্ভীর্য থাকে, তিনি সেখানে নিজের বাচনভঙ্গি, চোখের এক্সপ্রেশন ও সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে এনেছিলেন এক অনন্য মাত্রা।
কেবল স্ক্রিপ্ট দেখে খবর পড়া নয়, বরং সংবাদের পেছনের ঘটনাকে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলার দক্ষতাই তাঁকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে এক পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
কাজী জেসিন এর পরিচয়
- পেশাগত পরিচয়: মহাপরিচালক (বিটিভি), প্রযুক্তিবিদ (সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তর), প্রবীণ সাংবাদিক ও সাবেক টিভি উপস্থাপক।
- সাহিত্যিক ઓળখ: নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে লিটল ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ ও কবিতা লেখার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অনুভূতির আত্মহনন’ ও ‘প্রত্যাখানের পদ্ম’।
- সাংবাদিকতা ও উপস্থাপনা: ২০০৩ সাল থেকে পরবর্তী দুই দশক তিনি এনটিভি, একুশে টিভি, চ্যানেল ওয়ান, এটিএন বাংলা, বাংলাভিশন, যমুনা টেলিভিশন এবং দৈনিক আমার দেশ-এ দায়িত্ব পালন করেছেন। টকশো উপস্থাপক হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি পান, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক টকশো ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ এবং ব্যক্তিত্বভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘তিনি’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।
- আন্তর্জাতিক পেশাগত অভিজ্ঞতা (যুক্তরাষ্ট্র): আমেরিকায় অবস্থানকালে তিনি মার্কিন গণমাধ্যম সংস্থা Comcast (NBC Universal)-এ ব্রডকাস্ট ও ওটিটি টেকনোলজি টিমে, Bank of America-র এন্টারপ্রাইজ সাইবার নিরাপত্তা টিমে এবং নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অফ পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন-এ ই-গভর্ন্যান্স ও ডিজিটাল অবকাঠামো বাস্তবায়নে কাজ করেছেন।
- শিক্ষা ও ফেলোশিপ: তিনি যুক্তরাজ্যের কামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিডারশিপ ও টেকসই উন্নয়নে এমবিএ করেন। এছাড়া তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের IVLP (International Visitor Leadership Program) ফেলো এবং নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির ওপর ডিগ্রিধারী।
পড়াশুনা ও ক্যারিয়ার
কাজী জেসিন বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত কবি, সাংবাদিক, লেখক, টিভি উপস্থাপক এবং প্রযুক্তিবিদ। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
- উচ্চশিক্ষা: তিনি যুক্তরাজ্যের কামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (University of Cumbria) এবং রবার্ট কেনেডি কলেজ থেকে লিডারশিপ ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
- পেশাগত ট্রেনিং ও ফেলোশিপ: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনস্থ মর্যাদাপূর্ণ International Visitor Leadership Program (IVLP)-এর নিউ মিডিয়া টেকনোলজি বিষয়ক ফেলো ছিলেন।
- নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির ওপর বিশেষ পেশাগত সনদ অর্জন করেন।
কর্মজীবন ও পেশাগত সাফল্য
সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন উপস্থাপনা (বাংলাদেশ)
- ১৯৯৭ সালে লিটল ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে তাঁর লেখালেখির পথচলা শুরু হয়।
- ২০০৩ সাল থেকে পরবর্তী দুই দশকে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে এনটিভি, একুশে টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, এটিএন বাংলা, বাংলাভিশন, যমুনা টেলিভিশন এবং দৈনিক আমার দেশ।
- বাংলাদেশে টকশো উপস্থাপনায়, বিশেষ করে নারী উপস্থাপক হিসেবে রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিষয়ের টকশোকে নিয়মিত ও জনপ্রিয় ধারায় রূপ দিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর আলোচিত টকশো ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ এবং আত্মজীবনীমূলক অনুষ্ঠান ‘তিনি’ ব্যাপক পরিচিতি পায়।
- ২০১৯ সালে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরাম থেকে ‘এক্সিলেন্স ইন জার্নালিজম’ পুরস্কার পান।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক ক্যারিয়ার
- পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থানকালে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে কর্পোরেট ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।
- তিনি মার্কিন গণমাধ্যম জায়ান্ট Comcast (NBC Universal)-এর প্রযুক্তি বিভাগে ব্রডকাস্ট ও OTT প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন।
- এরপর Bank of America-র এন্টারপ্রাইজ টেকনোলজি টিমে Zelle লেনদেনের জালিয়াতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত কাজ সামলান।
- এছাড়া নিউইয়র্ক সিটির Department of Parks and Recreation-এ প্রযুক্তি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা (ই-গভর্ন্যান্স ও সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাম্প্রতিক দায়িত্ব (বিটিভি ডিজি)
২০২৬ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ১ বছরের জন্য গ্রেড-১ পদে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করে।
শুরুর দিনগুলো ও মিডিয়ার প্রতি টান
কাজী জেসিনের মিডিয়া যাত্রার শুরুটা হুট করে হয়নি। ছোটবেলা থেকেই কথা বলার স্পষ্টতা, উচ্চারণশৈলী এবং পারফর্মিং আর্টের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত রেখেছিলেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা ও সংবাদ উপস্থাপনাকে যখন তিনি পেশা হিসেবে বেছে নেন, তখন তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার এই স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাস বিশাল ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গণ্ডি পার হওয়ার পরপরই গণমাধ্যমের জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক জগতে পা রাখেন কাজী জেসিন। শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও নিজের একটি আলাদা ভয়েস বা কণ্ঠস্বর তৈরি করা।
টেলিভিশন সংবাদে নিজস্ব স্বাক্ষর
বাংলাদেশের প্রধান সারির বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কাজ করার মাধ্যমে কাজী জেসিন দ্রুতই দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেন। বিশেষ করে সংবাদের সময় লাইভ বুলেটিন সামলানো কিংবা হঠাৎ চলে আসা ব্রেকিং নিউজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তথ্য পরিবেশন করার ক্ষেত্রে তাঁর পারদর্শিতা চোখে পড়ার মতো ছিল।
সংবাদ উপস্থাপনায় অনেকেই একটি বাঁধাধরা কণ্ঠস্বর বা কৃত্রিম গাম্ভীর্য ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু জেসিনের উপস্থাপনায় ছিল সাবলীলতা ও মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এক অদ্ভুত ক্ষমতা।
- জটিল রাজনৈতিক খবর হোক কিংবা মানবিক গল্পের বুলেটিন -তাঁর বাচনভঙ্গি খবরের মেজাজের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তিত হতো। এই দূরদর্শী উপস্থাপনা তাঁকে খুব অল্প সময়েই সংবাদ দর্শকদের অন্যতম প্রিয় মুখে পরিণত করে।
টেলিভিশন থেকে ডিজিটাল মিডিয়ায় রূপান্তর
এখানেই কাজী জেসিনের মূল পার্থক্য। অনেক সাংবাদিক বা সংবাদ উপস্থাপক পুরো জীবন প্রথাগত টেলিভিশনের স্টুডিওর ভেতরেই কাটিয়ে দেন। কিন্তু কাজী জেসিন সময় ও প্রযুক্তির চাহিদাকে দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। টেলিভিশনের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সেন্সরশিপ বা নীতিমালার বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ তিনি বেছে নেন।
টেলিভিশন স্টুডিও থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে আসার এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। প্রথাগত মিডিয়ায় পেছন থেকে প্রডিউসার, ক্যামেরা টিম ও মেকআপ টিমের একটি বড় সাপোর্ট থাকে। কিন্তু ডিজিটাল মিডিয়ায় নিজের ব্র্যান্ডিং এবং কনটেন্টের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। জেসিন সেই রূপান্তরটি ঘটিয়েছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে।
তিনি কেবল টিভির খবর পড়া চেহারায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের মত প্রকাশ, ইন্টারভিউ শো এবং প্রামাণ্য ধাঁচের কনটেন্টে যুক্ত হয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজস্ব প্রভাব ও জনমত
আজকের দিনে একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের প্রভাব কেবল তিনি কোন চ্যানেলে কাজ করছেন তার ওপর নির্ভর করে না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কাজী জেসিন তাঁর সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে নানা নাগরিক সমস্যা, সামাজিক অসঙ্গতি এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে থাকেন।
সংবাদ উপস্থাপকের নিরপেক্ষতার খোলস ছেড়ে যখন তিনি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কথা বলেন, তখন তরুণ প্রজন্ম তাঁর যুক্তিবাদী বক্তব্যের সাথে সহজে নিজেকে কানেক্ট করতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন যে, একজন পেশাদার সাংবাদিক একই সাথে কীভাবে একজন দায়িত্বশীল ইনফ্লুয়েন্সার হতে পারেন।
তরুণ প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক
আজকের দিনে যাঁরা সংবাদ উপস্থাপনা বা গণমাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্য কাজী জেসিনের কাজের ধরণ এক বড় শেখার জায়গা। ক্যামেরা ফেসিং, কথার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা এবং ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়া কেন জরুরি—তা তাঁর কাজ দেখলেই বোঝা যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মেধা ও দক্ষতাকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ফ্রেমে বন্দী না রেখে সময়ের সাথে কীভাবে নিজেকে নতুন করে রি-ইনভেন্ট (Re-invent) করতে হয়, কাজী জেসিন তাঁর চমৎকার উদাহরণ।
শেষ কথা
কাজী জেসিন কেবল একজন সংবাদ উপস্থাপক নন; তিনি বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের সেই রূপান্তরকালীন সময়ের প্রতিনিধি, যে সময়ে খবর কেবল টিভির পর্দা থেকে বেরিয়ে আমাদের হাতের মুঠোফোনে চলে এসেছে। খবরের প্রতি তাঁর পেশাদারিত্ব এবং ডিজিটাল যুগে নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা তাঁকে আগামী দিনগুলোতেও গণমাধ্যম আলোচনার কেন্দ্রে রাখবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

