রাজশাহীতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া বৃদ্ধি এবং আলু পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়া পর্যন্ত আলু সংরক্ষণের ভাড়া আগের নিয়মে প্রতি কেজিতে ৬ টাকা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে, যা আলু চাষি এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সাময়িক স্বস্তির খবর।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশর অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল রাজশাহী। আলু সংরক্ষণের ভাড়া ও পরিবহন খরচ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পেলে তা সরাসরি মাঠপর্যায়ের চাষি ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে বাজারে আলুর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে আলুর দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চরম মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ।
কী ঘটছে?
রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সভায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ ও পরিবহন ভাড়া নিয়ে উদ্ভূত সংকট সমাধানের লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলীকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।
জরুরি সভায় সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়া ৬ টাকা বহাল থাকবে। এর চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া কোনো হিমাগার কর্তৃপক্ষ আদায় করতে পারবে না।
মূল দ্বন্দ্ব ও উভয় পক্ষের বক্তব্য
- ব্যবসায়ী ও চাষিদের অবস্থান: রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি অভিযোগ করেন, হিমাগার মালিকদের এক বস্তা আলু সংরক্ষণে সর্বোচ্চ খরচ হয় ১০০ টাকা। কিন্তু তারা চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন ৪৭৫ টাকা, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং জুলুমের শামিল। এই অতিরিক্ত ভাড়ার প্রতিবাদে চাষি ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন এবং যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত আলু না তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।
- হিমাগার মালিকদের যুক্তি: অন্যদিকে, রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলুর রহমান দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি এবং হিমাগার পরিচালনার সার্বিক খরচ পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই যৌক্তিক কারণেই ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গত বছর ভাড়া বৃদ্ধির পর চাষিদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে অনেক ছাড় দিয়ে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার ভাড়া কমানোর দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রেক্ষাপট: হিমাগারে আলুর ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রাজশাহী অঞ্চলে অসন্তোষ দেখা দেয়। অতীতেও এই ধরনের সংকটে হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যা নিরসনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খল বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আলু একটি অত্যন্ত পচনশীল পণ্য হওয়ায় হিমাগারের ওপর চাষিদের নির্ভরতা শতভাগ। কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির চেষ্টা মাঠপর্যায়ের কৃষি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে চাষিরা আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
সামনের দিনগুলোতে: জেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত খরচ, বিদ্যুতের দাম এবং পরিচালনা ব্যয় বিশ্লেষণ করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই আলু সংরক্ষণের চূড়ান্ত যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। ততদিন পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে আলু কেনাবেচা ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপের ফলে আলু বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা সাময়িকভাবে প্রশমিত হয়েছে।

