ফুটবলে রূপকথার গল্পগুলো বোধহয় এমনই হয়। চোখের পলকে বদলে যায় দৃশ্যপট। ২০২২ সালের আগস্ট মাসের কথাও যদি ধরি, ফুটবল বিশ্বের কজনই বা এনসো ফের্নান্দেসের নাম জানত? ইউরোপিয়ান ফুটবলে তখনো তিনি আনকোরা এক তরুণ।
অথচ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে সেই তরুণই হয়ে উঠলেন বিশ্বকাপজয়ী, জিতলেন টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার। আর জানুয়ারির দলবদলে গড়লেন প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম দামি ট্রান্সফারের রেকর্ড।
এনসোর এই গল্পটা কেবল বল পায়ে জাদুর নয়। এটি সঠিক সময়ে জ্বলে ওঠার, নিজেকে প্রমাণ করার এবং তীব্র চাপের মুখে ভেঙে না পড়ার এক অসাধারণ আখ্যান।
শুরুর কথা: রিভার প্লেট ও গ্যালার্দোর প্রভাব
আর্জেন্টিনার সান মার্টিনে জন্ম নেওয়া এনসোর নামের সাথেই জড়িয়ে আছে ফুটবলের ইতিহাস। বাবা ছিলেন উরুগুইয়ান কিংবদন্তি এনসো ফ্রান্সেসগুলির অন্ধ ভক্ত। ছেলের নাম তাই প্রিয় তারকার নামেই রাখলেন। রিভার প্লেটের একাডেমিতে যখন তার হাতেখড়ি, তখনো কেউ ভাবেনি এই ছেলে একদিন আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের কান্ডারি হবে।
তবে তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল দেফেন্সা ওয়াই জাস্টিসিয়ায় ধারে খেলতে যাওয়া। সেখানে কিংবদন্তি স্ট্রাইকার হারনান ক্রেসপোর অধীনে তিনি পেশাদার ফুটবলের কঠোরতা শিখলেন। এরপর যখন রিভার প্লেটে ফিরলেন, ততদিনে তিনি পরিণত এক মিডফিল্ডার। কোচ মার্সেলো গ্যালার্দোর হাই-প্রেসিং ফুটবলের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হলেন তিনি। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, নিখুঁত পাসিং আর দূরপাল্লার শটে গোল করার ক্ষমতা তাকে দ্রুতই স্পটলাইটে নিয়ে আসে।
ইউরোপের দরজা: বেনফিকায় দ্রুত উত্থান
দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিভাগুলো সাধারণত ইউরোপে এসে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয়। কিন্তু এনসোর ডিকশনারিতে যেন ‘সময় নেওয়া’ শব্দটা ছিল না। ২০২২ সালের গ্রীষ্মে পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকায় যোগ দিয়েই তিনি মাঝমাঠের দখল নিলেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চে পিএসজি বা জুভেন্টাসের মতো বড় দলগুলোর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। তার বল ডিস্ট্রিবিউশন আর প্রেসিং দেখে তখন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর স্কাউটরা নিজেদের নোটবুকে এনসোর নামের পাশে লাল দাগ দিয়ে রাখতে শুরু করেছিলেন।
কাতার বিশ্বকাপ ২০২২: স্কালোনির তুরুপের তাস
লুসাইল স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই ম্যাচটার কথা মনে আছে? সৌদি আরবের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা তখন খাদের কিনারায়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামলেন এনসো। লিওনেল মেসির পাস থেকে ডি-বক্সের ভেতর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডান পায়ের যে বাঁকানো শটে গোলটি তিনি করলেন, সেটি কেবল একটি গোল ছিল না। সেটি ছিল বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
এরপর আর তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সাহস করেননি লিওনেল স্কালোনি। ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পলের সাথে মিলে এনসো এমন এক মাঝমাঠ তৈরি করলেন, যা আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেল। বল রিকভারি, ট্রানজিশন এবং মেসিতে বল সাপ্লাই দেওয়ার কাজটা তিনি করলেন নিখুঁতভাবে। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছিল বড় মঞ্চে তিনি কতটা অবিচল।
চেলসিতে রেকর্ড ট্রান্সফার ও প্রিমিয়ার লিগের লড়াই
বিশ্বকাপের পর এনসোকে দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইউরোপের জায়ান্টরা। শেষ হাসি হাসে চেলসি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১০৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল অঙ্কে তাকে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নিয়ে আসে ব্লুজরা।
কিন্তু চেলসিতে তার সময়টা খুব মসৃণ হয়নি। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, ঘন ঘন কোচ পরিবর্তন এবং দলের সামগ্রিক খারাপ পারফরম্যান্সের প্রভাব তার ওপরও পড়েছে। এত দাম দিয়ে কেনা খেলোয়াড়ের কাছে ভক্তদের প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। সেই প্রত্যাশার চাপ আর ইংলিশ ফুটবলের গতির সাথে মানিয়ে নিতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তারপরও যখনই চেলসি কিছুটা ছন্দে ফিরেছে, তার পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন এই আর্জেন্টাইন।
২০২৬ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনার নতুন ইতিহাস ও সেমিফাইনালে এনসোর জাদুকরী মুহূর্ত
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে এনসো ফের্নান্দেসের গুরুত্বটা আরও পরিষ্কার হয়। টুর্নামেন্টের শুরুতে নিজের ফর্ম নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা ঠিকই জানেন কখন জ্বলে উঠতে হয়। আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড যখন এগিয়ে গেল, মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন বুঝি ওখানেই শেষ। ঠিক সেই খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুললেন এনসো। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা পিছিয়ে। এমন সময় একটি শর্ট কর্নার থেকে লিওনেল মেসি ডি-বক্সের বাইরে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা এনসোকে বল বাড়ান। প্রথম স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জর্ডান পিকফোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে অসাধারণ এক বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান তিনি। এই একটা গোল পুরো ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দেয়। এরপর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে লৌতারো মার্তিনেজের গোলে ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্কালোনির দল। ম্যাচ শেষে এনসো নিজেই স্বীকার করেছেন, সেমিফাইনালে দেশের হয়ে গোল করাটা তার কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো। চাপের মুখে এই যে শান্ত থেকে নিজের কাজটা করে আসা, এটাই এনসোকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করে।
মানসিক লড়াই: বুয়েনস আইরেস থেকে লন্ডনের জীবনে মানিয়ে নেওয়া
ফুটবল পণ্ডিতরা এনসোর পাসিং ম্যাপ নিয়ে কাঁটাছেড়া করেন, কিন্তু তার মানসিক দৃঢ়তার দিকটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। একবার ভাবুন, মাত্র আট মাসের ব্যবধানে একটা ছেলে রিভার প্লেট থেকে বেনফিকা, সেখান থেকে বিশ্বকাপ জয়, এবং এরপর লন্ডনের গ্ল্যামারাস তবে নিষ্ঠুর ফুটবল পরিবেশে এসে পড়ল।
এই দ্রুত উত্থান অনেক প্রতিভাবান ফুটবলারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যাশার ভারে নুয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এনসো দেখিয়েছেন তার স্নায়ু কতটা শক্ত। চেলসির বাজে সময়ে যখন পুরো দল সমালোচনার তীরে বিদ্ধ, তখনো তিনি মাঠে নিজের শতভাগ দিয়ে গেছেন। ভাষা, সংস্কৃতি এবং খেলার ধরন—সবকিছু রাতারাতি বদলে যাওয়ার পরও মানসিকভাবে স্থির থাকাটা প্রমাণ করে তার ভেতরের চ্যাম্পিয়ন মানসিকতাকে।
ট্যাকটিকাল বিবর্তন: ছকের বাইরের এনসো—কেবল ‘নাম্বার ৮’ নাকি আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত ‘ডিপ-লায়িং প্লেমেকার’?
এনসোকে আসলে মাঠের কোথায় খেলানো উচিত? এই প্রশ্নটা চেলসির প্রায় প্রতিটি কোচকেই ভাবিয়েছে। রিভার প্লেট এবং বেনফিকায় তিনি মূলত ‘ডাবল পিভট’ বা ডিপ-লায়িং প্লেমেকার হিসেবে খেলেছেন, যেখান থেকে পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণ তার পায়ে থাকত। কিন্তু চেলসিতে মরিসিও পচেত্তিনো তাকে অনেক সময় আক্রমণাত্মক রোলে বা ‘নাম্বার ১০’ এর কাছাকাছি খেলিয়েছেন।
এনসো এমন একজন খেলোয়াড় যিনি প্রথাগত ‘নাম্বার ৬’ (ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) বা ‘নাম্বার ৮’ (বক্স-টু-বক্স)—কোনো নির্দিষ্ট ছকেই পুরোপুরি বন্দি নন। তার লং বল খেলার দারুণ ক্ষমতা আছে, আবার ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইন ভাঙতেও তিনি সিদ্ধহস্ত।
আধুনিক ফুটবলে যাকে ‘রেজিস্তা’ বলা হয়, এনসো ঠিক সেই ঘরানার। তবে তাকে তার সেরা রূপে পেতে হলে পেছনে একজন সলিড ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থাকা জরুরি, যে তাকে স্বাধীনভাবে বল নিয়ে ওপরে ওঠার সুযোগ করে দেবে।
মাঝমাঠের অবিসংবাদিত নেতা
এনসো ফের্নান্দেসের বয়স সবে পঁচিশ। একজন মিডফিল্ডারের আসল পরিপক্বতা আসে এই বয়সের পরই। কাতার বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন এক বিস্ময় বালক, আর ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি পরিণত এক নেতা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক সেমিফাইনাল প্রমাণ করে দিয়েছে, দলের বিপর্যয়ে হাল ধরতে তিনি কতটা প্রস্তুত।
মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই গোলের পর মেসি বলেছিলেন, এনসো স্পেশাল। ফুটবলের ঈশ্বর যার সম্পর্কে এমন সার্টিফিকেট দেন এবং ২০২৬ এর সেমিফাইনালে খাদের কিনারা থেকে যাকে দিয়ে গোল করান, তার ওপর ভরসা না রেখে উপায় নেই। নিউ জার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত। সেখানেও যদি এনসো নিজের সেরাটা দিতে পারেন, তবে বিশ্ব ফুটবলের মাঝমাঠ আগামী বেশ কয়েক বছর এই আর্জেন্টাইনের দখলেই থাকবে।
মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই গোলের পর মেসি বলেছিলেন, “এনসো স্পেশাল।” ফুটবলের ঈশ্বর যার সম্পর্কে এমন সার্টিফিকেট দেন, তার ভবিষ্যৎ যে কতটা উজ্জ্বল হতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বজয়ের মেডেলটা তার গলার শোভাবর্ধন করেছে ঠিকই, তবে এনসো ফের্নান্দেসের সেরাটা আসা এখনো বাকি।

